চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে শুরু করে ব্যবসা ও আলোচিত হত্যাকাণ্ড—সব জায়গাতেই রহস্য আর বিতর্কের নাম আজিজ মোহাম্মদ ভাই। জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন এই ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক। প্রায় তিন দশক পরও তার নাম ঘুরে ফিরে আসে নানা আলোচনায়।
আজিজ মোহাম্মদের নামের সঙ্গে যুক্ত ‘ভাই’ শব্দটিকে অনেকে গডফাদার বা প্রভাবশালী অর্থে দেখলেও, আসলে এটি তাদের পারিবারিক পদবি। তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নামের শেষে ‘ভাই’ শব্দটি যুক্ত— এমনকি নারীদের নামেও। তার বাবা-মায়ের নামও মোহাম্মদ ভাই ও খাদিজা মোহাম্মদ ভাই।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তাদের পরিবার ভারতের গুজরাট থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসে। পারস্য বংশোদ্ভূত এই পরিবার ‘বাহাইয়ান’ সম্প্রদায়ের অনুসারী। সময়ের সঙ্গে ‘বাহাই’ শব্দটি স্থানীয় উচ্চারণে ‘ভাই’ হয়ে যায়।
পুরান ঢাকায় বসবাস শুরু করা এই পরিবারের ঘরেই ১৯৬২ সালে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের জন্ম। পারিবারিক ব্যবসা থেকেই তিনি নিজের পথচলা শুরু করেন। পরবর্তীতে হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য খাতে দেশ-বিদেশে তার বিপুল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে— ঢাকা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং ও সিঙ্গাপুর পর্যন্ত।
ব্যবসার পাশাপাশি ৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নাম লেখান তিনি। ‘এমবি ফিল্মস’-এর ব্যানারে প্রায় ৫০টির মতো সিনেমা প্রযোজনা করেন। বলা হয়, সিনেমার প্রতি ভালোবাসা, নায়িকাদের রূপ, কালো টাকা সাদা করা— নাকি শুধু মিডিয়ার আলোচনায় থাকার উদ্দেশ্য— ঠিক কোন কারণে তিনি চলচ্চিত্রে আসেন, তা আজও রহস্যময়।
এরশাদের আমলে একবার গ্রেফতারও হন তিনি। তখন গুঞ্জন ওঠে, এক নারীকে কেন্দ্র করেই সেই গ্রেফতার। চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী ও নারীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে তখনও মুখর ছিল মিডিয়া ও সামাজিক পরিমণ্ডল।
এছাড়া এক পত্রিকা সম্পাদককে হত্যার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে, যা পরে ‘হার্ট অ্যাটাক’ হিসেবে প্রচার করা হয়। তবে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৭ সালে— সালমান শাহর মৃত্যুর পর। বলা হয়, এক পার্টিতে সালমানের স্ত্রী সামিরাকে চুমু খাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে সালমান তাকে চড় মারেন। এরপরই শুরু হয় গুঞ্জন— সালমানের মৃত্যুর পেছনে কি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের হাত ছিল? এই মামলায় তাকে দুইবার জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়, যদিও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপর ১৯৯৯ সালে ঢাকা ক্লাবে খুন হন অভিনেতা সোহেল চৌধুরী। এই হত্যাকাণ্ডেও আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও তার পরিবারের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তখন ঢাকার ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই নাকি এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে ধারণা।
বর্তমানে তিনি সপরিবারে থাইল্যান্ডে বসবাস করছেন এবং সেখান থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তার স্ত্রী নওরিন মোহাম্মদ ভাই দেশে এসে ব্যবসার তদারকি করেন।
রহস্য, প্রভাব আর বিতর্ক— এই তিনেই যেন গড়া আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের জীবন। একদিকে সফল ব্যবসায়ী, অন্যদিকে অপরাধ জগত ও চলচ্চিত্রের অন্দরের আলোচিত এক নাম— এখনো তিনি রয়ে গেছেন রহস্যের মোড়কে।
মন্তব্য করুন