কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়াকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণে এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। চামড়াশিল্প রক্ষা, পাচার প্রতিরোধ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে ২০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দ দিয়েছে।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চামড়া সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর মনোভাবের কথা জানান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কুরবানির চামড়া যাতে নষ্ট না হয় এবং বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য এবার আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিনামূল্যে লবণ ও প্রশিক্ষণ
সরকার স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র সংগ্রহকারী, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি কসাই, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্টদের চামড়া সংরক্ষণে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতে অনেক সময় কুরবানির চামড়া পানির দরে বিক্রি হয়েছে কিংবা সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়েছে। অথচ দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে চামড়াশিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই এবার এক টুকরো চামড়াও যাতে নষ্ট না হয়, সে লক্ষ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পাচার রোধে কড়াকড়ি
ঈদের পর কয়েকদিন সীমান্তমুখী চামড়াবাহী ট্রাক চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাজার তদারকি, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং ধর্মীয় সমাবেশে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে।
সরকারি নির্ধারিত দামের নিচে যাতে চামড়া কেনাবেচা না হয় এবং কোনো সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সেদিকেও কঠোর নজরদারি থাকবে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত চামড়ার গুরুত্ব
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে মানসম্মত চামড়ার বিকল্প নেই। পশু জবাইয়ের তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার করে চামড়া সংরক্ষণ করতে হবে, না হলে পচন ধরে মান নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ট্যানারিগুলো কুরবানির মৌসুমে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার ও পানির সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না।
২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ
অর্থ বিভাগ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ২০ কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে। এই অর্থ লবণ ক্রয় ও বিতরণ, সচেতনতামূলক প্রচারণা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, লজিস্টিক সহায়তা এবং অস্থায়ী সংরক্ষণাগার ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হবে।
মাদ্রাসা ও এতিমখানা পাচ্ছে বিশেষ সহায়তা
বাংলাদেশে কুরবানির চামড়ার বড় অংশ মাদ্রাসা ও এতিমখানার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সংরক্ষণে অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক সময় এসব চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এবার সরকার এসব প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি প্রকল্পের আওতায় এনে সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে
সরকারের এই উদ্যোগে চামড়াশিল্পে নতুন আশার সঞ্চার হলেও পরিবহন ব্যবস্থা এবং ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধের বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্যানারি মালিকদেরও কঠোর নজরদারির আওতায় রাখা হবে।
মন্তব্য করুন